প্রত্যেকটা মানুষের অনেকগুলো বন্ধুদল থাকে। জীবনে সকল বন্ধুদলের আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে, থাকে। যখন ছুটিতে গ্রামে ফিরে যেতাম ঢাকা রয়ে যেতো ঢাকাতে। বন্ধুবান্ধবও তাই।
কমলাপুর রেল স্টেশনের কাছে ছিল বি আর টি সি বাস টার্মিনাল। সবেধন নীলমনি ঐ একটাই বাস ছিল, যে বাসে চড়ে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা যাওয়া যেতো। টিকিট পেতে ওখানে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়াতাম। টিকিট শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না সে ভাবনায় বুক ধুঁকপুক করতো। টিকিট পেয়ে গেলে মনে হয়েছে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছি।
রিকশায় ফিরতে ফিরতে গ্রামের বন্ধুদেরকে অগ্রিম জানিয়ে দেবো কি না ভেবেছি। কখনো তাদের কোনো একজনকে হয়তো টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দিয়েছি, আসছি। জানতে পারলে তারা খুশি হয়েছে। বন্ধুরা কেউ চাষবাস করে, কেউ স্কুলে মাস্টারি করে, কেউ করে ব্যবসা, কেউ কেউ ছিল রাজনীতি বা সমাজসেবা করে বেড়াতো।
গ্রামে আসছি জানলে বন্ধুদের খুশির কারণ, তাঁদের রোজকার মুখস্ত জীবন, ছক কাটা জীবনে ক’টা দিন নতুন রকমের আড্ডা, খাওয়া, গল্পের বিষয়ে নতুন নতুন উপাদান যোগ হবে। সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া বা বিলে মাছ ধরতে যাওয়া হব।
সাত দশদিনের মধ্যে অন্তত তিন চারটি বিশেষ কি কি ঘটনা ঘটানো যায়, ভাবতাম সবাই মিলে। বন্ধুত্ব তখন শুধু সম্পর্ক নয়, এ সে উপলক্ষ্য তৈরি করে বন্ধুত্ব, সম্পর্ককে উদযাপন করাই ছিল মনের সুখ, আগ্রহ বা ইচ্ছা।
তখন জীবন বৈচিত্র্য খুঁজেছে, আনন্দের সন্ধান করেছে। উড়েছে, ছুটেছে, ভেসেছে। জীবন অতি সামান্যতে খুশি হতে জানতো। মনে আশা ছিল ভরপুর আর বন্ধুরা বন্ধুই ছিল, তাই কোনো নিরাশ হওয়ার ঘটনা হঠাৎ এসে জেঁকে বসতে চাইলে মন জায়গা দিতো না।
গ্রামে ছিল একটা বন্ধু দল। শহরে অনেকগুলো। আর্ট কলেজে ছিল একটা, ঢাকা থিয়েটারে ছিল আর একটা দল। চাঁদের হাট তৈরি করে দিয়েছিল আরো একটা বন্ধুদল। ঢাকা থিয়েটার, চাঁদের হাট এবং সাগরের কিছু বন্ধু মিলে তৈরি হয়ে যায় খাবার দাবারের বন্ধুদল।
নানা ধ্যান ধারণার, জ্ঞানের, দর্শনের, বিচিত্র সংস্কৃতির ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ একসাথে হওয়া, একসাথে কাটানো, কাটাতে পারা ছিল অতি সৌভাগ্যের। জীবনটাকে মনে হতো অনেকগুলো ঘরের একটা বাড়ি।
সে বাড়ির সব দরজা জানালা সর্বদাই থেকেছে উন্মুক্ত। সম্পর্কে রোদ হাওয়ার অভাব কখনোই হয়নি।
ঢাকা থেকে সাতক্ষীরাগামী বাস আরিচা ঘাটে পৌঁছালে আশপাশের হোটেল থেকে ডাক আসতো, টাটকা ইলিশ খাবেন, আসেন আসেন গরমা গরম টাটকা ইলিশ ভাঁজা। নদীপারে দাঁড়ালে দেখা যেতো দূরে মাঝ নদীতে মাঝিদের ব্যস্ততা। দৃশ্যমান হতো পানির নিচ থেকে জাল টেনে তোলা হচ্ছে সেই জালে ঝিকমিক করছে অসংখ্য ইলিশ।
তখন ইলিশ দামের মাছ নয়, সখের মাছ। বাস থেকে নামলেই ধুলো আর মবিলের গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা দিতো।
গাড়ি থামতো ফেরিঘাট থেকে খানিকটা দূরে। যাত্রীরা বাস থেকে নেমে মাটিতে পা রেখেই তাকাতো, ঘাট কতটা দূরে। চোখের হিসাবে সেই দূরত্ব মেপে সবাই অনুমান করে নিতে পারতো কতক্ষণ পরে নিজেদের বাসটা ফেরীতে উঠতে পারবে। অপেক্ষারত বাসের লাইন বেশি দীর্ঘ হলে খুব ধীরস্থির পায়ে বহুজন এগিয়ে যেতো পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাতের হোটেলগুলোর দিকে।
হোটেলগুলোর কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই বোঝা যেতো ধুলো, তেলমবিলের গন্ধ ফিঁকে হতে শুরু করেছে। ফিঁকে হতে হতে একসময় মনে হতো, অন্য একটা লোভনীয় ঘ্রাণ উড়ে এসে জুড়ে বসতে শুরু করেছে মগজে ও মনে। সে টান প্রক্ষাগৃহের মতো করেই নিঃশব্দে আহ্বান করতো, এসো জলদি এসো।
তখন শহরের সিনেমা হলগুলোর সামনে দিয়ে গেলে হল থেকে বেরিয়ে আসা অতি চমৎকার একটা ঘ্রাণ মনকে ধরে টান মারতো। সে ঘ্রাণের টান উপেক্ষা করা সহজ ছিল না। ঘ্রাণের সাথে প্রেক্ষাগৃহের ভিতর থেকে কখনো কখনো এক পশলা শীতল বাতাস বেরিয়ে এলে মনে হয়েছে খুবই আদুরে ভঙ্গিতে ডাকছে, এসো এসো, খুব ভালো সিনেমা চলছে, সিনেমাটা দেখে যাও।
ঠিক একই কায়দায় আরিচা ফেরি ঘাটে নামা যাত্রীদের টান মারতো ভাজা ইলিশের ঘ্রাণ।
মিলন, ইমদাদুল হক মিলন আমার সঙ্গে পারুলিয়া যাচ্ছে। ইলিশ মাছের ঘ্রাণে তার মনে পড়ে, ঘাটে নেমে গরম ভাতের সাথে তিন চার টুকরা ইলিশ খাওয়ার গল্প বন্ধুদের আসরে অনেক অনেকবার বলেছি। দাঁড়িয়ে পড়ে মিলন, নিশ্চয়ই এখন আমরা গরম ভাতের সাথে ভাঁজা ইলিশ মাছ খেতে ঢুকবো।
এতো ভাত আমি কখনো খাইনি। ফেরিতে উঠে মিলন হাত শোঁকে। বলে, কসকো সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছি, হাত থেকে তো ইলিশের গন্ধ যায়নি।
আমরা একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে। সামনে আকাশ, বিস্তৃত জলরাশি। নদীতে পাল তোলা নৌকা, ছৈ ছাড়া, ছৈ অলা, ছোট বড় নৌকা, জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা এই সব ফেলে আমাদের ফেরি এগিয়ে চলেছে।
মিলন বলে, নদী নৌকা, মাছধরা, বক উড়ে যাচ্ছে, পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে মাছরাঙা, এই আকাশ, মুক্ত হাওয়া কিছুই আমার কাছে নতুন নয় কিন্তু নতুন ঠেকছে আজ। পারুলিয়ার পথে তোর সাথে এই ভ্রমনের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই নতুন ও বিশেষ হবে।
পারুলিয়া আমার গ্রামের নাম। সাতক্ষীরা শহর থেকে দক্ষিন দিকে সুন্দরবন, সেইদিকে যেতে থাকলে এক জায়গায় রাস্তাটা ভাগ হয়ে দুটো পথ হয়ে যায়। সোজা পথটা চলে গেছে সীমান্তে। সেদিকে না গিয়ে বামদিকে এগারো কিলোমিটার দূরে পড়ে পারুলিয়া।
খাবার দাবারে বসে খুব আগ্রহ নিয়ে অনেকদিন পারুলিয়ার গল্প শুনেছে মিলন। মিলন আমাদের শোনাতো বিক্রমপুরের গল্প। ফরীদি, হুমায়ুন ফরীদি বলতো, আমার কোনো ছেলেবেলা নেই আমি বহুকাল ধরে তোদের বয়সী। তারপর হাহা করে হাসতো।
সেই খাবার দাবার কাঁপানো হাসি শুনে দরজার পাল্লাটা অর্ধেক খুলে বাইরে থেকে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে সাগর বলতো, নতুন কোনো জোক্স শোনালো ফরীদি?
জবাব ফরীদিই দিতো, শোনাইনি, শোনাবো। যে হাসি শুনেছো সেটা জোক্স বলার আগের হাসি। জোক্স শোনাবার আগে নিজে হেসে সবাইকে বুঝিয়ে দিলাম, হাসি পেলে এভাবেই হাসতে হবে।
সাগরের পিছনে সিরাজকে দেখা যায়। সাগরকে সরিয়ে দিয়ে ছোট্ট ঘরটায় ঢোকে শাইখ সিরাজ। ফরীদির দিকে তাকিয়ে বলে, আজ নতুন কি শোনাবি শোনা। ফরীদি এক কোনায় বসা ছিল, আমি তার পাশে। উঠে আমার উপর দিয়ে ঝুঁকে সে সিরাজের হাত ধরে কিছুটা কাছে টেনে আনে। তারপর সিরাজের কপালে বুড়ো আঙুল ঘষে সেই আঙুলটা নিজের কপালে চেপে ধরে। সবাই চুপ। অধীর অপেক্ষায়, কি বলবে সে।
ফরীদি বলে, তোর গা থেকে রং নিয়ে কপালে কালো টিপ লাগিয়ে নিলাম, কারো নজর লাগবে না।
